রবিবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১৫

যেভাবে সিনেমা আবিষ্কার হলো

(একটি ১৬ মিমি স্প্রিং-অউন্ড বোলেক্স এইচ১৬ রিফ্লেক্স ক্যামেরা। চলচ্চিত্রের স্কুলগুলোতে প্রথমে এই ক্যামেরা দিয়ে পরিচয় করানো হয়।)

সিনেমা বা চলচিত্র মানুষের মনোরঞ্জনের এক সস্তা মাধ্যম।বিশ্বের প্রায় আড়াই লক্ষ প্রেক্ষাগৃহে প্রতিদিন প্রয় কোটি কোটি লোক আজ ছবি দেখে।চলচিত্রের বর্তমান অবস্থায় আসতে প্রায় একশ বছর লেগেছে।ক্যামেরা, আলোকচিত্র বিদ্যা এবং আলোক অভিক্ষেপণ যন্ত্রের বিকাশ সাধন চলচিত্রের উন্নতি সাধনে বিশেষভাবে সাহায্য করেছে।চলচিত্রের কাহিনি শুরু ১৮৩০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে।মানুষ তখন ছবি খোদাইকৃত ঘূর্ণায়মান চাকা তৈরি করেছে।এ চাকাগুলোকে বলা হতো জীবনচক্র।এ চাকাগুলো এত জোরে ঘোরানো হতো যে খোদাইকৃত ছবিগুলো নরছে বলে মনে হতো।চলচিত্রের জন্ম প্রকৃতপক্ষে ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে।১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে টমাস আলভা এডিসন কিনেটোস্কোপ নামে এক যন্ত্র আবিষ্কার করেন।এর এক ছিদ্র পথে একবারে একটা মাত্র লোক যন্ত্রের ভিতরের ছবি দেখতে পারতো।ছবিগুলো সাধারণত হতো ঘোড়া দৌড়ের অথবা বাচ্চাদের সাঁতার কাটার।দ্য গ্রেট ট্মেন রবারি নামে পৃথিবীর প্রথম ছায়াছবি তৈরি হয় ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে টমাস আলভা এডিসনের গবেষণাগারে।ঘটনাটি ছিল দারুণ রোমাঞ্চকর।প্রথম ছায়াছবি ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকার পিটাসবার্গ শহরে দেখানো হয়।এর কিছুদিন পরে টমাস আরামাথ নামক এক ব্যক্তি চলচিত্রের সার্বজনীন প্রদশর্নীর জন্যএক আলো অভিক্ষেপক যন্ত্র তৈরি করেন।এডিসনও এ যন্ত্রের অনেক উন্নতি সাধন করেন।তখনকার দিনে যে চলচিত্র তৈরি হতো তা হতো নির্বাক।আলো অভিক্ষেপক যন্ত্র প্রতি সেকেন্ডে ২৪টি চিত্রকে পর্দায় নিয়ে আসত।এ ছবিগুলো একের পর এক দ্রুতগতিতে হাজির হতো আর তার ফলে ছবিগুলো নরছে বলে মনে হতো।সেলুলোজ ফিল্মের ওপর এ ছবিগুলো প্রথম তোলা হতো।তারপর সময় যত পার হয়ে চললো সিনেমা শিল্পেও তত উন্নতি হতে লাগলো।১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকায় প্রথম সুরেলা ছায়াছবি ডন জুয়ান তৈরি হয়।প্রথম সবাক চিত্র দ্য জাজ সিঙ্গার রি করেন ওয়ারনার ভ্রাতৃবর্গ ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকাতে।দাদা সাহেব ফাল্কে ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম ভারতীয় ছায়াছবি রাজা হরিশচন্দ্র তৈরি করেন।রঙিন ছায়াছবির আর্বিরভাব চলচিত্র শিল্পের ইতিহাসেআর এক নতুন পদক্ষেপ।চলচিত্র দেখার সবচেয়ে বেশি আগ্রহ তাইওয়ানবাসীদের।রাশিয়াতে প্রায় দেড় লাখ প্রেক্ষাগৃহ আছে।পৃথিবীর সব থেকে বড় ও উন্মুক্ত প্রেক্ষাগৃহ হলো পশ্চিম বার্লিনে।এ প্রেক্ষাগৃহে ২২ হাজার লোক এক সঙ্গে বসে ছবি দেখতে পারে।পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম ছবি দ্যহিউম্যান কনডিশন ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে জাপানে দেখানো হয়।এ ছায়াছবির একটি শেষ হতে সময় লেগেছিল ৮ ঘন্টা ৫০ মিনিট। বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচিত্রের নাম মুখ ও মুখোশ।


চলচ্চিত্র এক প্রকারের দৃশ্যমান বিনোদন মাধ্যম। চলমান চিত্র তথা "মোশন পিকচার" থেকে চলচ্চিত্র শব্দটি এসেছে। এটি একটি বিশেষ শিল্প মাধ্যম। বাস্তব জগতের চলমান ছবি ক্যামেরার মাধ্যমে ধারণ করে বা এনিমেশনের মাধ্যমে কাল্পনিক জগৎ তৈরি করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। চলচ্চিত্রের ধারণা অনেক পরে এসেছে, উনবিংশ শতকের শেষ দিকে। আর এনিমেশন চিত্রের ধারণা এসেছে আরও পরে। বাংলায় চলচ্চিত্রের প্রতিশব্দ হিসেবে ছায়াছবি, সিনেমা, মুভি বা ফিল্ম শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়।

চলচ্চিত্রের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে সাংস্কৃতিক উপাদানসমূহ। যে সংস্কৃতিতে তা নির্মিত হয় তাকেই প্রতিনিধিত্ব করে চলচ্চিত্রটি। শিল্পকলার প্রভাবশালী মাধ্যম, শক্তিশালী বিনোদন মাধ্যম এবং শিক্ষার অন্যতম সেরা উপকরণ হিসেবে খ্যাতি রয়েছে চলচ্চিত্রের। ছায়াছবির সাথে ভিজ্যুয়াল বিশ্বের সমন্বয় থাকায় সাধারণ মানুষের সাথে সবচেয়ে ভাল যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। অন্য কোন শিল্পমাধ্যম সাধারণের সাথে এতোটা যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম নয়। অন্য ভাষার চলচ্চিত্রের ডাবিং বা সাবটাইটেল করার মাধ্যমে নিজ ভাষায় নিয়ে আসার প্রচলন রয়েছে।

প্রথাগতভাবে চলচ্চিত্র নির্মিত হয় অনেকগুলো একক ছবি তথা ফ্রেমের ধারাবাহিক সমন্বয়ের মাধ্যমে। এই স্থিরচিত্রগুলি যখন খুব দ্রুত দেখানো হয় তখন দর্শক মনে করেন তিনি চলমান কিছু দেখছেন। প্রতিটি ছবির মাঝে যে বিরতি তা একটি বিশেষ কারণে দর্শকের চোখে ধরা পড়ে না। ধরা না পড়ার এই বিষয়টাকে দৃষ্টির স্থায়িত্ব বলে। সহজ কথা বলা যায়, ছবির উৎস সরিয়ে ফেলার পরও এক সেকেন্ডের ১০ ভাগের ১ ভাগ সময় ধরে দর্শকের মনে তার রেশ থেকে যায়। এভাবে চলমান ছবির ধারণা লাভের বিষয়টাকে মনোবিজ্ঞানে বিটা চলন নামে আখ্যায়িত করা হয়।


কৃত্রিমভাবে দ্বিমাত্রিক চলমান ছবি তৈরির কৌশল আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৮৬০-এর দশকে। তখন জোট্রোপ এবং প্র্যাক্সিনোস্কোপ নামক যন্ত্র দিয়ে এ ধরণের ছবি তৈরি করা যেতো। একেবারে সাধারণ আলোক যন্ত্রের (ম্যাজিক লণ্ঠন) উন্নতি সাধন করে এগুলো তৈরি করা হয়েছিল। এগুলোর মাধ্যমে ধারাবাহিক কতগুলো স্থিরচিত্র একটার পর একটা এতো দ্রুত পরিবর্তন করা যেতো যে দর্শকের চোখে পরিবর্তন খুব একটা ধরা পড়তো না। ছবিগুলোকে খুব যত্ন সহকারে ডিজাইন করতে হতো যাতে কোন খুঁত না থাকে। এই ধারণাটিই পরবর্তীতে এনিমেশন চিত্র নির্মাণের মূলনীতি হয়ে দেখা দিয়েছিলো।

স্থির চিত্রগ্রহণে সেলুলয়েড ফিল্ম আসার পর চলমান বস্তুর সরাসরি ছবি তোলা সম্ভব হলো। প্রাথমিক যুগে একটি ড্রামের মধ্যে বেশ কিছু ছবি লাগিয়ে ড্রামটিকে জোড়ে ঘুরানো হতো। একটা বিশেষ দিক থেকে দর্শক ড্রামের দিকে তাকালে চলমান চিত্র দেখতে পেতো। ড্রামের গতি ছিল সাধারণত সেকেন্ডে ৫ বা ১০ বার এবং ড্রামগুলো কয়েনের মাধ্যমে অর্থ আদায় করতো। ১৮৮০'র দশকে চলচ্চিত্র ক্যামেরা উদ্ভাবিত হয়। এর মাধ্যমে অনেকগুলো স্থিরচিত্রকে একটি মাত্র রিলে সংরক্ষণ করা যেতো। এই রিলগুলোকে পরবর্তীতে চলচ্চিত্র রূপে দেখানো হতো প্রজেক্টরের মাধ্যমে। প্রজেক্টরের আলো রিলের উপর ফেলা হতো এবং রিলের ছবিগুলোকে বিবর্ধিত করে একটি বড় পর্দার উপর ফেলা হতো যা দর্শকরা দেখতে পেতো। প্রথম দিককার চলচ্চিত্রগুলো সবই ছিল বাস্তব ঘটনার সরাসরি দৃশ্যায়ন এবং প্রদর্শন। সেখানে কোন সম্পাদনা বা চলচ্চিত্ররূপী উপস্থাপনার সুযোগ ছিল না।

১৮৯৪ সালের দিকেই ডিকসন শব্দ এবং ছবি একসাথে ধারণের পরীক্ষা শুরু করেছিলেন। কিন্তু তার সে প্রচেষ্টাকে এড়িয়ে গিয়ে নির্বাক চলচ্চিত্র প্রাধান্য বিস্তার করে এবং জনমনে বিশেষ ছাপ ফেলতে সক্ষম হয়। উনবিংশ শতকের শেষ পর্যন্ত নির্বাক চলচ্চিত্রই ছিল একমাত্র চলমান শিল্প মাধ্যম। বিংশ শতকের শুরুতে চলচ্চিত্র বর্ণনামূলক ধারায় রূপ নিতে শুরু করে। অনেকগুলো দৃশ্যকে একসাথে জোড়া লাগিয়ে এবং প্রত্যেকটির জন্য বর্ণনাভঙ্গি নির্দিষ্ট করে, প্রচার করা হতে থাকে। ধীরে ধীরে দৃশ্যগুলোকে বিভিন্ন আক্র এবং কোণ থেকে নেয়া অনেকগুলো শটে ভাগ করা হয়। এছাড়া চলমান ক্যামেরার মাধ্যমে চলচ্চিত্র গল্প ফুটিয়ে তোলার কৌশল আবিষ্কৃত হয়। তখনও ছবি নির্বাক ছিল। কিন্তু, প্রতিটি শটের সাথে মিল রেখে সঙ্গীত এবং বাজনা বাজানোর জন্য সিনেমা হলে বা মঞ্চে অর্কেস্ট্রা দল থাকতো। বড় বড় প্রযোজনা কোম্পানিগুলো এসবের ব্যবস্থা করতো।


হলিউডের উত্থানের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলচ্চিত্র বিকশিত হয়ে উঠলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে ইউরোপে এই শিল্পটি ততোটা বিকশিত হয়ে উঠতে পারেনি। অবশ্য ১৯২০-এর দশক থেকে সের্গে আইজেনস্টাইন, এফ ডব্লিউ মার্নো এবং ফ্রিৎস ল্যাং এর মতো ইউরোপীয় পরিচালকরা ডি ডব্লিউ গ্রিফিথ, চার্লি চ্যাপলিন, বুস্টার কিটন প্রমুখ মার্কিন পরিচালক ও অভিনেতাদের সাথে মিলে ইউরোপে চলচ্চিত্র বিস্তারের কাজ শুরু করেন। এই দশকেই প্রযুক্তির উন্নয়নের কারণে চলচ্চিত্রের শটগুলোর সাথে ঐকতান বজায় রেখে শব্দ, সঙ্গীত এবং কথোপকথন যুক্ত করা সম্ভব হয়। উদ্ভব হয় সবাক চলচ্চিত্রের। ইংরেজতে এগুলোকে "টকিং পিকচার" বা সংক্ষেপে "টকি" (talky) বলা হতো।

এর পরে চলচ্চিত্র শিল্পে সবচেয়ে বড় সংযোজন ছিল "প্রাকৃতিক রঙ" যুক্ত করা। শব্দ যুক্ত করার পর খুব দ্রুত নির্বাক চলচ্চিত্র এবং মঞ্চের বাদ্য-বাজনা বিলীন হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু সাদাকালোর বদলে চলচ্চিত্র রঙের ব্যবহার করার প্রচলন অনেক ধীরে ধীরে হয়েছে। এর মূল কারণ ছিল রঙিন চলচ্চিত্রের খরচ এবং সামঞ্জস্য। প্রথমদিকে সাদা-কালো এবং রঙিন চলচ্চিত্রের প্রতি দর্শকদের দৃষ্টিভঙ্গি একই রকম ছিল। কিন্তু ক্রমাগত বেশী বেশী রঙিন চলচ্চিত্র নির্মিত হতে থাকে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকায় রঙিন চলচ্চিত্রই প্রাধান্য বিস্তার করে। কারণ প্রযোজকরা বুঝতে পারছিলেন, রঙিনের দিকে দর্শকদের ঝোঁক বেশী। আরও একটি কারণ ছিল, টেলিভিশন ১৯৬০-এর দশকের আগে রঙিন হয়নি। তাই টিভির সাদাকালোকে হারানোর জন্য চলচ্চিত্র রঙের সংযোজন আবশ্যক ছিল। ১৯৬০-এর দশকের পরে রঙিন চলচ্চিত্রই নির্মাতাদের মূল আকর্ষণ হয়ে উঠে।

১৯৬০ এর দশকে স্টুডিও পদ্ধতির পতনের পর কয়েক দশক জুড়ে চলচ্চিত্র জগতে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে চলচ্চিত্র শিক্ষা গুরুত্ব অর্জন করে। নব হলিউড, ফরাসি নবতরঙ্গ এবং বিভিন্ন চলচ্চিত্র স্কুলের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এটি ত্বরান্বিত হয়। আর ১৯৯০-এর দশকের পর ডিজিটাল প্রযুক্তি চলচ্চিত্র নির্মাণের একমাত্র মাধ্যম হয়ে উঠে।

তথ্যসূত্র : Wikipedia এবং Techtunes


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন